দেশে জ্বালানি তেলের বাজারে যখন অস্থিরতা বিরাজ করছে, ঠিক তখনই নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইলে পদ্মা অয়েল ডিপো সংলগ্ন শীতলক্ষ্যা নদীতে চলছে জ্বালানী তেল চুরির মহোৎসব। প্রতি রাতে জাহাজ থেকে হাজার হাজার লিটার তেল পাচার হয়ে যাচ্ছে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্রের হাতে। এলাকাবাসীর অভিযোগ , আওয়ামী লীগের ‘দোসর’ হিসেবে পরিচিত গোদনাইলের বাগবাড়ী এলাকার দুলাল শেখের ছেলে অনুপ শেখের নেতৃত্বে এই বিশাল চুরির সিন্ডিকেট পরিচালিত হচ্ছে। প্রশাসনের নাকের ডগায় এমন কান্ড ঘটলেও রহস্যজনক কারণে নীরব ভূমিকায় রয়েছে পুলিশসহ সংশ্লিষ্টরা।
রাতের অঁাধারে যেভাবে চলে লুটপাট
সরেজমিনে এবং স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যমতে, দিনের আলো নিভে গেলেই শীতলক্ষ্যার এই এলাকাটি অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়। চট্টগ্রাম ও কাঞ্চন থেকে এমটি ময়ূর পঙ্খি ,এমটি জল কুমারী, এমটি রুবেল ও এমভি তটিনী নামের ট্যাংকারে জ্বালানী তেল ভর্তি করে প্রতিদিন সন্ধ্যায় পদ্মা ডিপোতে আনা হয়। ট্যাংকারগুলো তেল খালাসের জন্য শীতলক্ষ্যা নদীতে নোঙর করা অবস্থায় অনুপ শেখের লোকেরা প্লাস্টিকের কেনের সাহায্যে রাতভর হাজার হাজার লিটার তেল নামিয়ে ফেলে। পরে এ তেল বাগবাড়ি এলাকার ভিতরের দিকে নির্মিত একটি বিশাল গোডাউনে মজুদ রাখেন। ভোরে এ তেল দেশের বিভিন্ন জেলায় পাচার করে। বিষয়টি স্থানীয়দের জানা থাকলেও অনুপ শেখের ভয়ে কেউ মুখ খোলেনা। তেল চুরি নির্বিগ্ন করতে তারা এলাকার কিছু যুবক ও কিশোর বয়সী ছেলেদের মাসোয়ারা দিয়ে সোর্স হিসেবে কাজ করায়। ডিপোর দক্ষিণ পাশের জলঘাটে লেটাপ অবস্থায় থাকা এমটি তটিনী নামের একটি জাহাজে অনুপ শেখ অফিস খুলেছে। এখান থেকেই প্রতি রাতে তেল এবং জাহাজে করে আনা ইয়াবার চালান দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। প্রতি রাতে এমভি তটিনী বসে ইয়াবা সেবনের আসর ।
নেপথ্যে ‘অনুপ সিন্ডিকেট’
তেল চুরির মূল হোতা গোদনাইলের বাগবাড়ী এলাকার আলোচিত অনুপ শেখ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও বিএনপির নাম ভাঙ্গিয়ে প্রভাব টিকিয়ে রেখেছেন এবং সিন্ডিকেটটি নিয়ন্ত্রণ করছেন। চক্রটি প্রথমে ডিপোর দক্ষিণ দিকের দেওয়ালের পাশে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সড়কের ওপর একটি ছোট দোকান নির্মাণ করে দুলাল শেখ, দুলাল শেখের বড় ছেলে মাসুম শেখ, মারুফ শেখ ও অনুপ শেখ ,ম্যানেজার আরিফ ও নৌকার লেবার সরদার আনার ও অন্যান্য লেবারদের নিয়ে চোরাই তেলে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। প্রথম দিকে সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে ছিলেন মারুফ শেখ । কিন্তু কিছুদিন আগে মারুফ শেখ মারা গেলে সিন্ডিকেটের পুরো নিয়ন্ত্রণ নেন তার ভাই অনুপ শেখ।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকায় তেল চুরি চললেও পুলিশ বা কোস্টগার্ডের কোনো জোরালো অভিযান দেখা যায়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সবাই জানে চোর কে, কিন্তু প্রশাসন কেন নির্বিকার তা আমাদের বোধগম্য নয়। মনে হয় সবাই এই তেলের ভাগ পাচ্ছে। বিশেষ করে ডিবি সোর্স আনোয়ার ও শিশুর মাধ্যমে বিশেষ সংস্থার লোকদের ম্যানেজ করা জন্য ঘুস হিসেবে টাকা পাঠানো হয় বলে সূত্র জানায় ।
এ ব্যাপারে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসি মহম্মদ আব্দুল বারিক জানান,এ ব্যাপারে কোন তথ্য তার কাছে নেই। নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তেল সংকটের এই সময়ে সরকারি সম্পদ এভাবে লোপাট হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা।
রাষ্ট্রীয় সম্পদের এই অপচয় ও লুটপাট বন্ধে দ্রুত উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী ও ব্যবসায়ীরা।