দ্বাদশ সাংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংগঠিত হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ জামায়াত শিবিরের ক্যাডাররা। নির্বাচনের আগ মুহুর্তে দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে সংসদ ভয়ঙ্কর নাশকতার ছক কষেছে নারায়ণগঞ্জ জামায়াত শিবিরের নেতৃবৃন্দ। পুলিশ সদস্যদের মনোবল ভেঙে দিতে সিনিয়র পুলিশ অফিসারদের তালিকা করে টার্গেট কিলিংয়ের পরিকল্পনা করে আসছে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামী নারায়ণগঞ্জ জামায়াত শিবিরের ক্যাডার বাহিনী। এমনকি তাদের মিশন বাস্তবায়নে নির্জন এলাকা বেছে একাধিক বৈঠকও করেছে তারা। ফতুল্লার কানাইনগর এলাকায় মুসুদ মন্ডলের ছেলে জামায়াতে ইসলামির সহযোগী সংগঠন ইসলামি ছাত্র শিবিরের রোকন সদস্য আনছিুর রহমানের বাড়ীতে এ গোপন মিটিং চালিয়ে আসছেন বলেও একাধিক সূত্রে প্রকাশ হয়েছে।
বিশেষ অ্যাপসের মাধ্যমে তাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন কেন্দ্রীয় নেতারা।গোয়েন্দা সূত্র জানায়, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করতে ১লা জানুয়ারী থেকে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিয়েছে শিবিরের প্রশিক্ষিত ক্যাডার বাহিনী। নির্বাচনের আগে পুলিশের মনোবল ভাঙতে টার্গেট কিলিংয়ের পরিকল্পনা নিয়ে সিনিয়র অফিসারদের একটি তালিকাও প্রস্তুত করেছে ছাত্রশিবির ক্যাডাররা।
সূত্রমতে, নারায়ণগঞ্জে বিএনপির ঘাড়ে চেপে শক্তিশালী হয়ে তাণ্ডব সৃষ্টিকারী জামায়াত-শিবিরের অপতৎপরতা রোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ ও পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ লক্ষ্যে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের তালিকা তৈরি করে তাদেরকে নজরদারির আওতায় আনা, দলটির কর্মকাণ্ডের প্রতি কঠোর নজর রাখা, তাদের যে কোনো ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড প্রতিহত করার প্রস্তুতি রাখা, পুলিশের সতর্ক থাকা ও টহল বাড়ানোর মাধ্যমে ভবিষ্যতে যে কোনো ধরনের অপতৎপরতা প্রতিরোধে হার্ডলাইনে রয়েছেন পুলিশ প্রশাসন। পুলিশ প্রশাসন সূত্র জানায়, ১৮ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক দল জামায়াত ও শিবিরের প্রায় ৫০০ নেতাকর্মীর একটি তালিকা প্রস্তুত করেছে গোয়েন্দা সংস্থা। জেলার ৭ থানা পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এ তালিকা তৈরির কাজ করেছে। তবে তালিকাটি এখন যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জে ভবিষ্যতে জামায়াত কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটালে তালিকাভুক্ত এসব নেতাকর্মীদের আসামি করা হতে পারে। তালিকায় জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের অন্তভুক্ত করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের গোয়েন্দা বিভাগের এক উর্দ্ধতন কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করে জানান, সরকার এখন জামায়াতের বিরুদ্ধে হার্ডলাইনে রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ জামায়াতের সামথর্য প্রসঙ্গে ওই কর্মকর্তা জানান, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গত ৫-৬ মাসের পযার্লোচনায় দেখা গেছে, এখানে বিএনপির পাশাপাশি জামায়াতও অনেক শক্তিশালী। বিএনপির অনেক কর্মসূচিতে জামায়াতের লোকজন উপস্থিত হয়ে তাদের শক্তির মহড়া দিচ্ছেন। তাছাড়া প্রায় সময়েই শহরের বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল করছে জামায়াত। সর্বশেষ গত ১৭ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জে ১৮ দলের একটি কর্মসূচিতে পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনায় অন্তত অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হন। ওই ঘটনার মূলে ছিল জামায়াত ও ছাত্রশিবির। তাদের নেতাকর্মীরা সেদিন উস্কানি দিলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। ১৭ সেপ্টেম্বর বিকেএমইএ’র নির্বাচনের দিনও শহরে ছাত্রশিবিরের মিছিলে পুলিশ বাধা দিলে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এছাড়া গত ৭ নভেম্বরের কর্মসূচিতে বিএনপির নেতাকর্মীরা বলেছিলেন, ‘‘নারায়ণগঞ্জে আন্দোলন-সংগ্রামে বিএনপির অন্যতম শক্তি হলো জামায়াত। আন্দোলনের স্বার্থে তাদেরকে আমাদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে। বিএনপির কাধে চড়ে নারায়ণগঞ্জে জামায়াত দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে বলেও খবর রয়েছে গোয়েন্দাদের কাছে। অতীতে ঢাকার পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জেও তাণ্ডব চালিয়েছিল জামায়াত। নারায়ণগঞ্জে জামায়াত শক্তিশালী হওয়ায় রাজধানীর পাশের এ জেলায় তারা যে কোনো সময়ে বড় ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। সে কারণে এ জেলায় জামায়াতকে একটু আলাদাভাবে নজর দেওয়া হচ্ছে। এদিকে স্থানীয় এলাকাবাসীর মাধ্যমে জানা যায়, ফতুল্লার বক্তাবলী ইউনিয়নের কানাই নগর এলাকায় মাসুদ মন্ডলের ছেলে ইসলামি ছাত্র শিবিরের রাজনীতির সাথে জড়িত আনিছুর রহমান এবং রিফাত ইদানিং দাড়ি টুপিওয়ালা অচেনা মানুষদের সাথে নিয়ে এলাকায় ঘুরাফেরা করছে। এমনকি এ সময় তারা এলাকার কারো সাথে কথাও বলেন না। প্রায় সময় গভীর রাতে অচেনা মানুষদের নিয়ে তাদের বাড়ীতে প্রবেশ এবং আনাগোনার কারনে নানা প্রশ্নের জন্ম নিয়েছে সাধারন মানুষদের মধ্যে। স্থানীয় এলাকাবাসীরা বলেন, গভীর রাতে কারা আসেন আনিছ এবং রিফাত নামের দুই সহোদরের কাছে। আর কিসের বৈঠক করেন তারা? হঠাৎ করে আনিছ এবং রিফাতদের বাড়ীতে অচেনা মানুষদের রহস্যজনক আনাঘোনার কারনে আতংক বিরাজ করছে। অনতিবিলম্বে শিবির ক্যাডার আনিছ এবং রিফাতের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জেলা পুলিশ প্রশাসন ব্যবস্থা নিবেন এমটাই দাবি করা সাধারন মানুষের পক্ষ থেকে।
এদিকে জেলা পুলিশের এক উর্দ্ধতন কর্মকর্তা বলেন, ইতিমধ্যে ৫০০ জনের একটি প্রাথমিক তালিকা করেছেন। তালিকার মধ্যে নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় ১০৭ জন, ফতুল্লা থানায় ১২৪ জন, সিদ্ধিরগঞ্জে ৯৪ জন, সোনারগাঁওয়ে ৭৪ জন, আড়াইহাজারে ৩০ জন, রূপগঞ্জে ৩৪ জন ও বন্দর থানায় ৩৭ জন । এ ব্যাপারে আরও খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে। এ তালিকা প্রয়োজনে সংযোজন ও বিয়োজন করা হতে পারে। জামায়াতের বিরুদ্ধে কঠোর অ্যাকশনে যেতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ইতিমধ্যে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে বুধবার নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার চাইলাউ মারমা বলেন, তালিকার বিষয়টি সত্য নয়। তবে জামায়াত ও শিবিরের কর্মকাণ্ডের প্রতি কঠোর নজর রাখা হয়েছে। তাদের যে কোনো ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড প্রতিহত করার নির্দেশনা রয়েছে।
ফতুল্লা মডেল থানার ওসি মেখ রেজাউল হক দিপু জানান, জামায়াত কিংবা শিবির যাতে পরিবেশ অস্থিতিশীল না করতে পারে, সেজন্য পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে। তাছাড়া বক্তাবলী কানাইনগর এলাকার মাসুদ মন্ডলের দুই ছেলে আনিছুর রহমান এবং রিফাতের বাড়ীতে গোঁপন বৈঠকের বিষয়ে খেঅঁজ খবর নেয়া হচ্ছে। যারাই কিনা অরাজকতা করার চেষ্টা করবে তাদেরকে কঠোর হাতে দমন করা হবে বলেও হুশিয়ারী উচ্চারন করেন তিনি।
নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গিয়াস উদ্দিন বলেন, ১৮ দলীয় জোটের সরকার বিরোধী আন্দোলন দেখে সরকার ভয় পেয়ে গেছে। এ কারণেই জোটের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করে হয়রানি করছে। পুলিশ প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হয়েও বৈষম্যমূলক আচরণ করছে। নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন খাঁন বলেন, তালিকা করে নেতাকর্মীদের হয়রানি করা যাবে। কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে যেভাবে সরকার বিরোধী মনোভাব তৈরি করেছে, তা দূর করা যাবে না। বিএনপি একাই যথেষ্ট সরকারের বিরুদ্ধে।