শুক্রবার, ১লা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৮ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজ শুক্রবার | ১লা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

চোরাই তেলের ব্যবসাকে পুঁজি করে টোকাই থেকে কোটিপতি পাভেল-বাবু

রবিবার, ০৬ নভেম্বর ২০২২ | ১০:৩৩ অপরাহ্ণ

চোরাই তেলের ব্যবসাকে পুঁজি করে টোকাই থেকে কোটিপতি পাভেল-বাবু

নিজস্ব প্রতিবেদক: জেলার শিল্পা ল অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত ফতুল্লা। শিল্পা ল এলাকা হিসেবে পরিচিত এ ফতুল্লায় জ্বালানী তেল সরবরাহকারী ডিপো স্থাপিত হয়েছে এ অ লে। বুড়িগঙ্গা নদী বেষ্ঠিত গড়ে উঠা জ্বালানী তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে একদল তেল চোর চক্রের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। যমুনা ও মেঘনা ডিপোর তেল চুরিকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে কয়েকদফা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

অস্ত্রের ঝনঝনানিতে আতংকিত হয়ে পড়ে ডিপোর কর্মরত সাধারন কর্মজীবি মানুষ। একটা সময় ক্ষমতার যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতাসীন দলের কথিত নেতারা নিয়ে নেন যমুনা ডিপোর চোরাই তেলের ব্যবসার নিয়ন্ত্রন। আর যমুনা ডিপোর চোরাই তেলের ব্যবসাকে পুঁজি করে কয়েক বছরে টোকাই থেকে কোটিপতি বনে গেছেন এমন ব্যাক্তির সংখ্যাও কম নয়। আর এ চোরাই তেলের ব্যবসার নিয়ন্ত্রন নিতে ব্যবহার করা হচ্ছে স্থানীয় সাংসদ থেকে শুরু করে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতাদের। ঠিক এমনি ভাবেই বর্তমানে ফতুল্লার যমুন ডিপোর চোরাই তেলের ব্যবসা নিয়ন্ত্রনে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের প্রয়াত সাংসদ নাসিম ওসমানের ছেলে আজমেরী ওসমানের নাম ব্যবহার করা হচ্ছে। বর্তমানে ফতুল্লার যমুনা ডিপোর চোরাই তেলের নিয়ন্ত্রক সাবেক সাংসদ মরহুমা সারাহ্ বেগম কবরীর ক্যাডার মির্জা পাভেল। বর্তমানে ভোল্ট পাল্টিয়ে ক্ষমতাসীনদলের প্রভাবশালী নেতা এবং সাংসদদ্বয়ের ছেলে এবং ভাতিজার নাম ব্যবহার করে চোরাই তেলের ব্যবসা নিয়ন্ত্রন করে আসছে দীর্ঘদীন ধরে। এদিকে সরকারী সম্পদ রক্ষার্থে হার্ডলাইনে যাওয়ার ঘোষনা দিয়েছেন ফতুল্লা মডেল থানার রিজাউল হক দিপু। যে কোন কিছুর বিনিময়ে ফতুল্লার শান্তি নিশ্চিত এবং সরকারী সম্পদ রক্ষার্থে যমুনা ও মেঘনা ডিপোকে কেন্দ্র করে তেলচোরদের চিহ্নিত করে অভিযান পরিচালনা করা হবে বলে ফতুল্লা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।

সূর্ত্রে জানা যায়, ফতুল্লার যমুনা ডিপোর তেলচোরদের নিয়ন্ত্রক‘পাভেল’ সবাই চিনে মির্জা পাভেল নামেই। বাবা হাবিবুর রহমান মুন্সি। নোয়াখালী জেলার হলেও নানা বাড়ির সূত্রে জন্মলগ্ন থেকেই প বটিতে। মামা প্রভাবশালী অঢেল ভূসম্পদের মালিক মৃত গফুর ভূইয়া। মামাতো ভাই, খোকা, সেন্টু, রিপন, পিপুল এবং মাসুদ ওরফে ওলা মাসুদ। তাদের মধ্যে খোকা ও সেন্টু ছিলেন ভাগিনা ফরিদ ও ক্রসফায়ারে নিহত মমিনউল্লাহ ডেভিডের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ৯৬ সালে মুকুল হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে খোকা, সেন্টুসহ তাদের ৫ ভাই এবং আত্মী স্বজনেরা যুক্ত হন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। যদিও চাচা আব্দুর রশিদ আগের থেকেই ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং চাচাতো ভাই মুকুল ছিলেন একই থানা যুবলীগের সভাপতি। ৯৬ সালে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় এলে বেপরোয়া হয়ে উঠে মাসুদ ওরফে ওলা মাসুদ। বিশাল বাহিনী আর ঝুট সন্ত্রাসী থেকে শুরু করে পুরো প বটি এলাকাতেই ছিলো তার আধিপত্য। সেই সুবাধে তার ফুপাতো ভাই মির্জা পাভেলর রাজনীতিতে হাতে খড়ি। উঠতি বয়স তার। ভাইদের দেখে দেখেই শেখা। তবে, এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি সে তখনও।

২০০১ সালে বিএনপি-জামাত জোট সরকার ক্ষমতায় এলে এলাকা ছেড়ে গা ঢাকা দেন মাসুদ। বসতি গড়েন ঢাকার কেরানীগঞ্জে। আর মির্জা পাভেল কোনো রকম গোবেচারা টাইপ এলাকাতেই থেকে যায়। তার ছোট ভাই বাবু। বর্তমানে যাকে মানুষ চেনে বেয়াদ্দব বাবু হিসেবে। অনেকের কাছে সে মেজর বাবু হিসেবেও পরিচিত। এই বাবু বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ছিলো। সেই সুবাধে পাভেলরা ছিলো সুরক্ষিত। কিন্তু ২০০৮ সালে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় এলে সেনা বাহিনীর চাকরি থেকে চলে আসেন বাবু। কথিত রয়েছে শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে তার চাকরি চলে যায়। তবে, তাদের মামাতো ভাই মাসুদ পূর্বের অবস্থান থেকে ফিরে এসে নিজদের ব্যবসা বাণিজ্য নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

তবে, পূর্বের স্বভাব বদলায়নি এখনও। সূত্র মতে, কবরী এমপি হওয়ার পর তার পিএস হন ঢাকা-৫ আসনের বিএনপির সাবেক এমপি সালাউদ্দিনের ঘনিষ্ঠজন সেন্টু। এপিএস হন লাল চুইলা শফি। এই দুইজনের হাত ধরে পাভেল ভিড়ে যায় কবরী বলয়ে। নিজে হয়ে উঠেন স্বঘোষিত ছাত্রলীগ নেতা। বিশাল হোন্ডা বাহিনী নিয়ে ফতুল্লা, প বটি, ধর্মগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা দাবড়িয়ে বেড়াতো সে। ফলে রাতারাতি এলাকাজুড়ে ‘কবরীর ক্যাডার’ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। সে সময়ই তার বাহিনী এবং তার ছোট ভাই মেজর বাবুর হাতে চলে আসে অবৈধ অস্ত্র।

পরবর্তীতে কবরীর সময় শেষ হলে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন শামীম ওসমান। রাতারাতি বোল পাল্টে শামীম ওসমান বলয়ে ফিরে আসে পাভেল ও তার ছোট ভাই বাবু। কিন্তু বিশেষ একটা সুবিধে করতে পারেনি। তখন তারা দুই ভাই স্থানীয় মাদক সেবী ও ব্যবসায়ীদের একত্রিত করে ভিড়ে যায় আজমেরী ওসমানের বলয়ে। এই সুবাধে পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রন চলে যায় তাদের হাতে। পূর্বের যে কোনো সময়ের থেকেও বেপরোয়া হয়ে উঠে মির্জা পাভেল, মির্জা বাবু ওরফে বেয়াদ্দব বাবু ওরফে মেজর বাবু। সূত্র মতে, আজমেরী ওসমানের নাম ভাঙিয়ে ফতুল্লার যমুনা ও মেঘনা ডিপোর চোরাই তেল ব্যবসার মূল নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠে পাভেল। তার সাথে তার ভাই বাবুও। বিশাল এক সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে প্রতিদিনই তেলবাহী জাহাজ, যমুনা ও মেঘনা ডিপো থেকে হাজার হাজার লিটার তেল চুরির মহোৎসবে মেতে উঠা তারা। সরকারি ঘরে চুরি করে রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে যাস তারা।

স্থানীয় পর্যায় থেকে জানা যায়, এলাকার ছোট বড় ছিচকে সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের বিরাট অংশই নিয়ন্ত্রণ করে পাভেল ও তার ছোট ভাই বাবু। প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পাভেলের অফিস খ্যাত তার মামা মৃত গফুর ভূঁইয়ার বাড়ির উল্টো দিকে আসর জমে। মাদকসেবী, বিক্রেতা আর তেল চুরির ভাগ বাটোয়ারা সবই হয় এখানে। এদিকে ক্ষমতাসীন দলের আর্শিবাদ থাকার কারণে তেল চুরির বেশ কয়েক বছর ধরে করে আসলেও পাভেলের টিকিটিও ছুঁতে পারেনি কেউ। ফলে এলাকাজুড়ে সে দুর্দান্ত প্রতাপের সাথেই তার অপকর্ম করে ফিরছিলেন।

বিগত সময়ে সাবেক এসপি হারুন নারায়ণগঞ্জে জেলা পুশি সুপার হিসেবে যোগদানের কয়েকদিন পরই ফতুল্লার চোরাই তেল ব্যবসায়ী ইকবালের আস্তানায় হানা দেয় ডিবি। কিন্তু তখনও সুরক্ষিত ছিলো পাভেলের ডেরা। ওই ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় পাভেল ও তার ভাই বাবুর নাম থাকলেও পুলিশ তাদেরকে গ্রেফতারে চেষ্টাও চালায়নি। শেষ পর্যন্ত র‌্যাব-১১ একটি দলের হাতে পাকড়াও হয় পাভেল ও তার এক সহযোগি উত্তম। ঐ সময়ে পাভেলের আটকের সংবাদে বৈধ তেল ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফিরে এলেও জামিনে বের হয়ে এসে পূনরায় পাভেল ও তার ভাই বাবু সেই পূর্বের অবস্থানেই ফিরে যান। এখনো রয়েছে বহাল তরিয়তে এমনকি রয়েছে তার বাহিনীও।

তেল চুরিও চলছে পূর্বের দুর্দান্ত প্রতাপে। সন্ত্রাস, মাদক বিক্রেতাদের শেল্টার চলছে আগের মতো। অস্ত্র শস্ত্র নিয়ে মহড়াও চলছে আগের মতো। তাই এলাকাবাসীর দাবি, সরকারী সম্পদ রক্ষাসহ এলাকার শান্তি বজায় রাখার ক্ষেত্রে তেল চোর কথিত ছাত্রলীগ নেতা পাভেলকে ও তার ছোট ভাই বেয়াদব বাবুকে গ্রেফতারের মাধ্যমে রক্ষিত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান পরিচালনা করবেন সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ। আর এ জন্য নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের নব্য পুলিশ সুপারের জরুরী হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সাধারন মানুষ।

এ ব্যাপারে ফতুল্লা মডেল থানার ওসি রিজাউল হক দিপু ফতুল্লা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাংবাদিকদের জানান,ফতুল্লাবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিন্তে বদ্ধ পরিকর স্থানীয় প্রশাসন। অপরাধী যত বড়ই ক্ষমতাশালী ব্যাক্তিই হউক না কেন তাদের ছাড় দেয়া হবে না। ফতুল্লার যমুনা ও মেঘনা ডিপোর চোরাই তেল ব্যবসায়ী ও নিয়ন্ত্রকদের তালিকা আমরা প্রস্তুত করেছি। বর্তমানে চোরাই তেলের ব্যবসার মাধ্যমে সরকারী রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে যারাই অবৈধভাবে সরকারী অর্থ আতœসাতের ঘটনায় জড়িত তাদের বিরুদ্ধে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন হার্ডলাইনে রয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।




সর্বশেষ  
জনপ্রিয়  

ফেসবুকে যুক্ত থাকুন