বিশেষ সংবাদদাতা:
একজন প্রকৌশলী যখন একটি উপজেলার দায়িত্ব নেন, তখন তাঁর হাতে থাকে শুধু নকশা, হিসাবের খাতা কিংবা উন্নয়ন প্রকল্পের ফাইল নয়; থাকে মানুষের প্রত্যাশারও একটি বড় অংশ। একটি রাস্তা তাঁর কাছে হয়তো কয়েক কিলোমিটারের একটি প্রকল্প; কিন্তু সেই রাস্তা দিয়ে যে কৃষক তাঁর ফসল বাজারে নেবেন, যে শিক্ষার্থী প্রতিদিন স্কুলে যাবে, যে রোগী দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছাতে চাইবে কিংবা যে ব্যবসায়ী পণ্য নিয়ে ছুটবেন; তাঁদের কাছে সেটিই হয়ে ওঠে জীবনের চলার পথ।
কাজেই রাস্তা কেবল ইট-বালু-খোয়ার সমষ্টি নয়। একটি ভালো রাস্তা একটি জনপদের গতি বদলে দেয়। আর কোনো কোনো মানুষ সেই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজের নামটি জড়িয়ে না রেখে নীরবে কাজ করে যান। বিদায়ের সময় তখন পদটি থেকে যায়, প্রকল্পের হিসাব থেকে যায়, কিন্তু মানুষের মুখে থেকে যায় মানুষটির ব্যবহার।
আড়াইহাজার উপজেলা প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম তেমনই একজন মানুষ; এমনটাই বলছেন তাঁর সঙ্গে কাজ করা এবং তাঁকে কাছ থেকে দেখা অনেকেই।
২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর আড়াইহাজার উপজেলা প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন মো. সাইফুল ইসলাম। আগামী ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তাঁর বিদায়। প্রায় দুই বছরের এই সময়ে তাঁর দায়িত্ব পালনের হিসাব করতে গেলে শুধু প্রকল্পের সংখ্যা দিয়ে তাঁকে মাপা কঠিন। কারণ তাঁর কাজের একটি অংশ কাগজে দেখা যায়, আরেকটি অংশ মানুষের স্মৃতিতে থেকে যায়।
আড়াইহাজারের যোগাযোগব্যবস্থার দিকে তাকালে তাঁর দায়িত্বকালীন সময়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের প্রশস্তকরণ ও উন্নয়নকাজের চিত্র পাওয়া যায়।
আড়াইহাজার-পুরিন্দা সড়ক প্রায় ১১ কিলোমিটার। বড় বিনাইরচর-বালিয়াপাড়া সড়ক ৬ কিলোমিটার। বালিয়াপাড়া-ফাউসা সড়ক প্রায় ৭ কিলোমিটার। কালিবাড়ী-মনোহরদী সড়ক লিংক রোডসহ প্রায় ৫ কিলোমিটার। আড়াইহাজার-জাঙ্গালিয়া বাজার-উচিতপুরা সড়ক ১১ কিলোমিটার এবং জাঙ্গালিয়া বাজার-শান্তির বাজার সড়ক ৭ কিলোমিটার। এসব সড়কের প্রতিটির প্রস্থ ১২ ফুট থেকে ১৮ ফুটে উন্নীত করা হয়েছে।
একটি রাস্তার প্রস্থ ছয় ফুট বাড়ানো শুনতে খুব বড় কোনো ঘটনা মনে নাও হতে পারে। কিন্তু জনপদের বাস্তবতায় এই কয়েক ফুট কখনো কখনো কয়েক বছরের ব্যবধান তৈরি করে। দুটি যানবাহনের পাশাপাশি চলাচল সহজ হয়, কমে সংঘাতের আশঙ্কা, বাড়ে চলাচলের গতি। আর গ্রামের সঙ্গে বাজার, বাজারের সঙ্গে শহর; সবকিছুর দূরত্ব যেন একটু কমে আসে। উন্নয়নের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য সম্ভবত এখানেই। তার প্রভাব অনেক সময় পরিসংখ্যানের চেয়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বেশি দৃশ্যমান।
কিছু কাজ শেষ হয়েছে, আবার কিছু কাজ এগিয়ে চলছে। উচিতপুরা-বিশনন্দী-মানিকপুর-গোপালদী সড়ক প্রায় ১১ কিলোমিটার। গোপালদী-মোল্লারচর সড়ক ৮ কিলোমিটার। কালিবাড়ী-পাঁচরুখী সড়ক লিংক রোডসহ প্রায় ৯ কিলোমিটার। এসব সড়কও ১২ ফুট থেকে ১৮ ফুটে প্রশস্তকরণের কাজ চলছে।
একটি উপজেলার যোগাযোগব্যবস্থার পরিবর্তন কোনো একদিনে ঘটে না। বছরের পর বছর ধরে নেওয়া পরিকল্পনা, প্রশাসনিক সমন্বয়, প্রকৌশলগত সিদ্ধান্ত, মাঠপর্যায়ের তদারকি; সব মিলিয়েই একটি রাস্তা মানুষের ব্যবহারের উপযোগী হয়ে ওঠে। ফলে একজন উপজেলা প্রকৌশলীর দায়িত্ব শুধু প্রকল্প বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধ থাকে না; তাঁকে একই সঙ্গে মাঠের বাস্তবতা, মানুষের প্রয়োজন এবং সরকারি উন্নয়ন পরিকল্পনার মধ্যে একটি সেতু তৈরি করতে হয়।
তবে মো. সাইফুল ইসলামের গল্পের সবচেয়ে আলোচিত দিক সম্ভবত তাঁর দাপ্তরিক কাজের বাইরের জায়গাটি। তাঁকে যারা কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁদের ভাষায় তিনি নম্র, ভদ্র এবং মিশুক মানুষ। কার সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয়; সেটিও তিনি জানেন। এই গুণটি সরকারি দপ্তরের একজন কর্মকর্তার জন্য খুব সাধারণ কোনো বিষয় নয়। কারণ একটি পদ মানুষকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। অফিসের টেবিল আর সাধারণ মানুষের মাঝখানে তৈরি হতে পারে অদৃশ্য দেয়াল। কিন্তু কোনো কর্মকর্তা যদি সেই দেয়ালটি নিজের আচরণ দিয়ে ভেঙে দিতে পারেন, তখন তাঁর দপ্তর শুধু প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান থাকে না; হয়ে ওঠে মানুষের কথা বলার জায়গা। সাইফুল ইসলামকে ঘিরে মানুষের প্রশংসার জায়গাটি সেখানেই।
তিনি হয়তো খুব বড় বড় কথা বলেননি। কিন্তু মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন স্বাভাবিকভাবে। নিজের পদমর্যাদাকে সামনে না রেখে মানুষটিকে সামনে রেখেছেন; এমন মূল্যায়নই পাওয়া যায় তাঁর সম্পর্কে।
সরকারি চাকরিতে বদলি ও বিদায় খুব স্বাভাবিক ঘটনা। আজ একজন, কাল আরেকজন। ফাইলের ওপর নাম বদলায়, অফিসের কক্ষে নতুন মুখ আসে। কিন্তু সব কর্মকর্তার বিদায় এক রকম হয় না।
কেউ চলে যান শুধু একটি পদ থেকে। আবার কেউ চলে যান একটি জায়গার মানুষের স্মৃতির ভেতর দিয়ে।
মো. সাইফুল ইসলামের বিদায়ের সময় আড়াইহাজারে হয়তো এমনই একটি অনুভূতি তৈরি হয়েছে; একজন কর্মকর্তা যাচ্ছেন, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া কাজগুলো রয়ে যাচ্ছে।
আড়াইহাজার-পুরিন্দা থেকে বালিয়াপাড়া, ফাউসা থেকে মনোহরদী, জাঙ্গালিয়া থেকে শান্তির বাজার; প্রশস্ত হওয়া কিংবা প্রশস্ত হওয়ার অপেক্ষায় থাকা সড়কগুলো তাঁর দায়িত্বকালের একটি দৃশ্যমান দলিল হয়ে থাকবে।
কিন্তু মানুষের সঙ্গে তাঁর ব্যবহার; সেটি কোনো প্রকল্পের তালিকায় লেখা থাকবে না।
কোনো টেন্ডার নথিতে লেখা থাকবে না একজন প্রকৌশলী কতটা নম্র ছিলেন। কোনো কার্যাদেশে লেখা থাকবে না তিনি মানুষের সঙ্গে কতটা আন্তরিকভাবে কথা বলতেন। সরকারি প্রতিবেদনে হয়তো তাঁর কাজের পরিমাণ পাওয়া যাবে; কিন্তু তাঁর আচরণের উষ্ণতা পাওয়া যাবে না। সেই হিসাব থাকে মানুষের মনে।
একজন প্রকৌশলী রাস্তা বানান। সময়ের সঙ্গে সেই রাস্তা আরও পুরোনো হয়, নতুন রাস্তা আসে, আবার কোনো রাস্তা সংস্কার হয়। কিন্তু মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণ; এটি একবার তৈরি হলে সহজে ভাঙে না।
সাইফুল ইসলামের আড়াইহাজার অধ্যায় তাই শুধু কয়েকটি সড়কের প্রশস্তকরণের গল্প নয়। এটি একজন সরকারি কর্মকর্তার দায়িত্ববোধের সঙ্গে মানবিকতার মেলবন্ধনের গল্পও।
১৪ অক্টোবর ২০২৪ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬; ক্যালেন্ডারের হিসাবে সময়টা দুই বছরেরও কম। কিন্তু একটি জনপদের স্মৃতিতে সময়ের দৈর্ঘ্য দিয়ে মানুষের মূল্যায়ন হয় না। হয় কাজ দিয়ে, ব্যবহার দিয়ে, মানুষের পাশে থাকার ধরন দিয়ে।
আড়াইহাজারে তাঁর দায়িত্বের সময় শেষ হচ্ছে। তিনি চলে যাবেন অন্য কোথাও, নতুন কোনো দায়িত্বে। তাঁর জায়গায় আসবেন নতুন কেউ। অফিসের দরজা একই থাকবে, টেবিল একই থাকবে, ফাইলের স্তূপও হয়তো একই থাকবে। শুধু বদলে যাবে চেয়ারে বসা মানুষটি।
তবে কিছু মানুষ চেয়ার ছেড়ে গেলেও তাঁদের ছাপ রেখে যান পথের ওপর, মানুষের কথায়, আর কোনো এক বিকেলে গ্রামের রাস্তা ধরে চলতে চলতে হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়া একটি নামের ভেতর।
মো. সাইফুল ইসলামের আড়াইহাজার অধ্যায়ের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো সেখানেই; তিনি শুধু কিছু রাস্তা প্রশস্ত করে যাননি; মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের যে পথটি তৈরি করেছিলেন, সেটিও প্রশস্ত করে গেছেন।
আর মানুষের হৃদয়ে তৈরি সেই পথের কোনো বিদায় নেই।
অফিস: অফিসঃ ৪৪ ক অতীশ দীপঙ্কর রোড, মুগদা, ঢাকা
বার্তা কক্ষ: ইমেইলঃ dailynarayanganjerdak@gmail.com মোবাইলঃ ০১৬১৫৫৩৭৭৫৫
কারিগরি সহযোগিতায় ফ্লাস টেকনোলজি ওয়েব সাইট www.flashtechnology.net