বৃহস্পতিবার, ১৮ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
আজ বৃহস্পতিবার | ১৮ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

নারায়ণগঞ্জে শিল্প-কারখানা ও বাসা বাড়িতে তীব্র গ্যাস সংকট

ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন, বাতিল হচ্ছে বিদেশি অর্ডার, ভোগান্তি চরমে

রবিবার, ২১ জানুয়ারি ২০২৪ | ৫:৩৭ পূর্বাহ্ণ

নারায়ণগঞ্জে শিল্প-কারখানা ও বাসা বাড়িতে তীব্র গ্যাস সংকট

প্রাচ্যের ড্যান্ডি নারায়ণগঞ্জে গ্যাস সংকট চরম আকার ধারন করেছে। কয়েক মাস ধরে লাইনে গ্যাসের চাপ কম থাকায় তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন শিল্প কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্যাসের চাপ সম্প্রতি আরও কমে যাওয়ায় চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে শিল্পোৎপাদন।
নারায়ণগঞ্জে গ্যাস নির্ভর ছয় শতাধিক শিল্প কারখানা রয়েছে। এন মধ্যে চার শতাধিক ডাইং কারখানা, অর্ধ শতাধিক রি-রোলিং ও স্টিল মিল, ৩৫টি চুন কারখানা, ৮টি সিমেন্ট কারখানা এবং ১০টি অটো সল্ট মিল রয়েছে। এসব শিল্প কারখানার উৎপাদন প্রায় বন্ধ। সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় পড়েছে রপ্তানিমুখী পোশাক খাত। বাতিল হচ্ছে বিদেশি অর্ডার। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। যেটি প্রভাব ফেলবে সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
এছাড়াও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়িতেও বেশ কিছুদিন ধরে গ্যাস সংকট চলছে। এতে রান্নার কাজে ব্যাঘাত ঘটায় এলাকাবাসী চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
ফতুল্লার বিসিক শিল্প নগরীর রপ্তানিমুখী কয়েকটি ডাইং কারখানা ঘুরে দেখা যায়, বিদেশি বায়ারদের অর্ডার পূরণ করতে উৎপাদনের চাপে শ্রমিকরা যেখানে দম ফেলার সময় পেতেন না, গ্যাসের অভাবে মেশিন বন্ধ থাকায় এখন তারা অলস সময় কাটাচ্ছেন। নষ্ট হচ্ছে গুদামে মজুদকৃত কোটি কোটি টাকার কাপড়। নারায়ণগঞ্জে গ্যাস নির্ভর অধিকাংশ শিল্প কারখানায় একই অবস্থা।
যে কারখানায় প্রতিদিন বিশ থেকে ত্রিশ মেট্রিক টন উৎপাদন হতো, এখন সেখানে এক টনও উৎপাদন হচ্ছে না। শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারিরা বসে থেকে অলস সময় কাটাচ্ছে।
কারখানার মালিক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কারখানার বয়লার চালানোর জন্য প্রতি ঘনফুটে ১৫ পিএসআই গ্যাসের চাপ থাকার কথা থাকলেও অনেক কারখানায় সেই গ্যাসের চাপ কমে প্রতি ঘনফুটে ১ থেকে ২ পিএসআইতে বিরাজ করছে। তবে গত দশ-বারোদিন ধরে নারায়ণগঞ্জের ডাইংসহ অন্যান্য শিল্প কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
এ অবস্থায় সময় মতো কাঙিক্ষত উৎপাদন করতে না পারায় আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছেন শিল্প কারখানার মালিকরা। এছাড়া পোশাক ক্রেতাদের চাহিদামতো সময়ে উৎপাদন সরবরাহ করতে না পারলে অনেক সময় অর্ডার বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যার কারণে কারখানাগুলোতে গ্যাস সরবরাহ যাতে স্বাভাবিক থাকে সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়ার দাবি করেছেন শিল্প কারখানার মালিকরা।
তাদের অভিযোগ, সরকার গ্যাসের দাম তিন গুণ বাড়ালেও শর্ত অনুযায়ী নিরবিচ্ছিন্ন গ্যাস দিতে পারছে না।
গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান তিতাস অফিস সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জসহ আশপাশের পাইপলাইনে গ্যাসের চাহিদা ৮৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সংকট আছে। নারায়ণগঞ্জসহ আশপাশের শিল্প-কারখানা ও বাসা-বাড়িতে গ্যাসের চাহিদা ১৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ন্যাচারাল বা পাইপলাইনে গ্যাসের চাহিদা ৮৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। আর এলএনজির চাহিদা ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু চাহিদার তুলনায় ন্যাচারাল গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এলএনজি মোটেও পাওয়া যাচ্ছে না।
বিকেএমইর সাবেক প্রথম সহসভাপতি ও ফতুল্লা ক্রোনি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এইচ আসলাম সানি বলেন, আমার দুইটা ফ্যাক্টরি টোটালি বন্ধ। একটা ফ্যাক্টরিতে কয়েক গুণ খরচ দিয়ে তেল ও এলএনজি কিনে এনে চালাচ্ছি। আরেকটা ফ্যাক্টরি চালাতে পারছি না। এতে আমাদের শীপমেন্টের মারাত্বকভাবে ক্ষতি হচ্ছে। এখন আমরা টুয়েন্টি ফাইভ পার্সেন্টও ফ্যাক্টরি চালাতে পারছি না। শীপমেন্টের বাকী মালগুলো ক্যানসেল হচ্ছে। ব্যাংকের পেমেন্ট দিতে পারবো না। এয়ার শীপমেন্ট হচ্ছে। যে পরিমান অর্থ লোকসান আমরা করছি, আমরা সাত বছরেও এই ক্ষতি পোষাতে পারবো না।
প্রত্যেকটা অর্ডারে আমরা কিন্তু ব্যাক টু ব্যাক এল সি করেছি। ব্যাংক থেকে ফাইন্যান্স নিয়েছি। এখন শত শত টন ফেব্রিক্স পড়ে আছে ডাইং করতে পারছি না। ফেব্রিক্সগুলো সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমরা মারাত্বকভাবে লসের সম্মুখীন হচ্ছি। শ্রমিকদের কাজ নাই। মাস শেষে তাদের বেতন দিতে হবে। গ্যাস না পেয়েও আমাকে গ্যাস বিল দিতে হবে। বাতাসের গ্যাস বিলও দিতে হবে। থ্রি হান্ড্রেড পার্সেন্ট বৃদ্ধি রেটে বিল দিতে হবে। এটা অমানবিক। এ ব্যাপারে আমরা সরকারকে বার বার বলছি। বিকেএমএই কথা বলছে। কেউ শুনছে না বা আমাদের প্রব্লেম টা কারো দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। ওভার অল এই লস বীয়ার করার ক্ষমতা আমাদের নাই।
সরকার যখন এলএনজির দাম, গ্যাসের দাম তিনগুণ বৃদ্ধি করলো তখন একটা কমিটমেন্ট ছিল আমাদের নিরবিচ্ছিন্ন গ্যাস দিবে। আমরা ব্যবসায়িরা বলেছিলাম দাম দিতে রাজি আছি কিন্তু নিরবিচ্ছিন্ন গ্যাস দিতে হবে। আজকে দাম বৃদ্ধির পরেও আমরা গ্যাস পাচ্ছি না। এই পরস্থিতিতে ফ্যাক্টরি বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া আমাদের কোন উপায় নাই।
নিট পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, তীব্র গ্যাস সংকট রয়েছে। দিনে বা রাতে কোনো সময়ই গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। গ্যাস সংকট তীব্র হওয়ার কারণে উৎপাদন একেবারেই বন্ধ রয়েছে। রপ্তানি অব্যাহত রাখতে হলে বিদেশ থেকে ফেব্রিকস আমদানি করতে হবে। এতে ডলার সংকট বাড়বে, রিজার্ভ আরও কমে আসবে এবং আমদানি ব্যয় বাড়বে।
অপরদিকে জেলা জুড়ে হাজার হাজার বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ নেই বললেই চলে। আবার এসব এলাকায় চোরাই পথে অবৈধ সংযোগ নিয়ে গ্যাস ব্যবহার করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। কখনো কখনো রান্নার চুল্লিতে একেবারেই থাকে না গ্যাসের সরবরাহ। এতে করে আবাসিক এলাকার লোকজন রান্না-বান্নায়ও পড়ছেন চরম ভোগান্তিতে। গভীর রাতে গ্যসের চাপ একটু বাড়ে ওই সময়টুকুতে রাত জেগে প্রয়োজনীয় রান্নার কাজ সারতে হয়। আবার অনেকেই লাইনের গ্যাসের পাশাপাশি এলপি গ্যাস ব্যবহার করছেন। এতে খরচের পরিমান দ্বিগুন বেড়ে গেছে।
সিদ্ধিরগঞ্জের একটি বহুতল ভবনের মালিক আহসান উল্লাহ জানান, গ্যাস সংকটের কারনে অধিকাংশ ভাড়াটিয়া বাসা ছেড়ে চলে গেছে। বর্তমানে বাসা ভাড়া কমিয়ে দেয়ার পরও ভাড়াটিয়া সংকটে পড়তে হচ্ছে। এতে ব্যাংকের লোন নিয়মিত পরিশোধ করা যাচ্ছেনা। অন্যদিকে গ্যাস ব্যবহার না করেও গ্যাসের বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে।




সর্বশেষ  
জনপ্রিয়  

ফেসবুকে যুক্ত থাকুন