ফাহাদুল ইসলাম সোনারগাঁ প্রতিনিধিঃ সোনারগাঁয়ে লাগামহীনভাবে চলছে শিশু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিন্ডারগার্টেনগুলো। ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লাখ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করলেও এর ওপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এখানে কী ধরনের শিক্ষা দেওয়া হয়, দেশে কতগুলো কিন্ডারগার্টেন আছে কিংবা এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কতৎ কিছুই জানা নেই সরকারের। কোনো কোনো কিন্ডারগার্টেনে বিদেশি পাঠ্যক্রম অনুসরণ করার কারণে সম্পূর্ণভাবে অগ্রাহ্য হচ্ছে দেশের ভাষা-ইতিহাস-ঐতিহ্য। এসব স্কুলে সরকারের বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাড়াও সহায়ক বইয়ের বাড়তি চাপে থাকে শিশুরা। এ ছাড়া ‘গলা কাটা’ টিউশন ও সেশন ফি আদায় করে রমরমা শিক্ষা বাণিজ্য চালাচ্ছে কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলো।
সরেজমিন দেখা গেছে, সোনারগাঁ উপজেলায় , বিভিন্ন ইউনিয়নে সারি সারি কিন্ডারগার্টেন স্কুল রয়েছে। কেবল মোগরাপাড়া ইউনিয়নের এক বর্গকিলোমিটার এলাকায়ই ১৫ -১৭টির মতো কিন্ডারগার্টেন গড়ে উঠেছে। মোগরাপাড়া ইউনিয়ন ও পৌরসভায় এলাকায় ডজনখানেক কিন্ডারগার্টেন স্কুল রয়েছে। এর মধ্যে মোগরাপাড়া চৌরাস্তা ও মোগরাপাড়া বাজারে ১০ এর অধিক কিন্ডারগার্টেন স্কুল রয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় একই বিল্ডিংয়ে রয়েছে একাধিক কিন্ডারগার্টেন স্কুল। অভিযোগ আছে, এভাবে সোনারগাঁ ছাড়াও সারা দেশে নিয়মনীতি ছাড়াই ব্যাঙের ছাতার মতো কিন্ডারগার্টেন বানিয়ে চলছে রমরমা শিক্ষা বাণিজ্য।
মোট সোনারগাঁ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে মাধ্যমিক ও প্রাথমিক মিলে এই পর্যন্ত গড়ে উঠেছে প্রায় ২২২টি কেজি স্কুল। এর মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেজি স্কুল রয়েছে ১৮৫টি। উপজেলা সদর ছাড়াও প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকা সত্ত্বেও পাশাপাশি গড়ে উঠেছে এসব কেজি স্কুল। নিজস্ব ভবন নেই, নিজেদের আয়ের উৎস নেই, সম্পূর্ণ ব্যবসায়ী মনোবৃত্তি নিয়ে গড়ে ওঠা বেশির ভাগ স্কুলে মান সম্মত শিক্ষক শিক্ষিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষানুরাগী সচেতন মহল। আবার অনেক স্কুল গড়ে ওঠার পর রাতারাতি ভাঙ্গনেরও দৃশ্য রয়েছে। এমনকি উপজেলা শিক্ষা অফিসে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম থাকলেও বর্তমানে কোথাও এর অস্তিত্ব নেই।
সারা দেশে ছড়ানো-ছিটানো প্রায় ৭০ হাজার বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের কিন্ডারগার্টেন (কেজি) স্কুল রয়েছে। নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করে বেসরকারি প্রাথমিক (বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যম) বিদ্যালয় নিবন্ধন বিধিমালা-২০১১ প্রণয়ন করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। পরবর্তী সময়ে কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোর কর্তৃপক্ষের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১২ সালের আগস্টে নিবন্ধন ফি ও ভূমির পরিমাণ কমানোসহ নয়টি বিধি সংশোধন করা হয়। কিন্তু সরকারি নীতিমালা থাকার পরও নিবন্ধন ছাড়াই শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছে এসব কিন্ডারগার্টেন স্কুল। শহরকেন্দ্রিক শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে সারাদেশে দিনদিন কেজি স্কুলের প্রসার ঘটছে। গত দু’দশকে এই স্কুলগুলোর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইংরেজি ও জাতীয় শিক্ষাক্রম অনুযায়ী চলা স্কুল। এগুলো চলছে অনেক ক্ষেত্রেই দোকানের আদলে মালিকের ইচ্ছামতো। নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ইচ্ছামতো টাকা নিচ্ছে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে। সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও তদারকিবিহীন এসব স্কুলের শিক্ষকদের নেই কোনো প্রশিক্ষণ, নেই ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা। শিক্ষক নিয়োগে মান নিয়ন্ত্রণ না থাকায় শিক্ষার মান নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। ফলে মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিশুরা। এসব প্রতিষ্ঠানে ইচ্ছামতো বিভিন্ন শ্রেণিতে পাঠ্যবইয়ের সংখ্যা বাড়ানো হয়।
প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিশুদের নির্ধারিত তিনটির বাইরে আরও ছয় থেকে দশটি বই দেওয়া হয়। বিভিন্ন স্কুলে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে বোর্ডের বাংলা, ইংরেজি, গণিতে তিনটি বিষয়ের সঙ্গে সহায়ক হিসেবে ধর্ম, পরিবেশ-পরিচিতি, বিজ্ঞান, ওয়ার্ড বুক, চিত্রাঙ্কণ, বাংলা ও ইংরেজি হাতের লেখা শেখার, সাধারণ জ্ঞান, নামতা-গুণ-ভাগ-জ্যামিতি আছে এমন একটি গণিত বই, ব্যাকরণ, ইংরেজি গ্রামার, গল্প ও কবিতার এবং কম্পিউটার শিক্ষা সংক্রান্ত বই দেওয়া হয়ে থাকে। স্কুলভেদে এসব বইয়ের সংখ্যা ও বিষয় কম-বেশি হয়ে থাকে। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়, বিজ্ঞান ও ধর্ম এই ছয়টি সরকারি বইয়ের সঙ্গে সহায়ক হিসেবে দেওয়া হয় ব্যাকরণ, ইংরেজি গ্রামার, কম্পিউটার, চিত্রাঙ্কণ ও দ্রুত পঠন ধরনের দুই থেকে ছয়টি বই
উল্লেখ্য, সংবিধান ও জাতীয় শিক্ষানীতিতে সবার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা বৈষম্যহীন ও একই মানের করার কথা বলা হয়েছে। সরকার নির্ধারিত বইয়ের বাইরে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়তি বিষয় পাঠ্য করতে চাইলে তার জন্য শিক্ষাসংশ্লিষ্ট অধিদফতরের অনুমতি নেওয়ার কথা বলা আছে। আর শিক্ষা আইনে বলা হয়েছে, প্রাক-প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত প্রতিটি শ্রেণির শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) প্রণয়ন করবে। বোর্ডের অনুমতি ছাড়া শিক্ষাক্রমে অতিরিক্ত কোনো বিষয় বা পাঠ্যবই অন্তর্ভুক্ত করলে দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে অনধিক ২ লাখ টাকা জরিমানা অথবা ৬ মাসের কারাদন্ড অথবা উভয় দন্ড দেওয়া হবে।
সোনারগাঁ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার দৌলতর রহমান জানান, বেসরকারি ভাবে গড়ে ওঠা এসব কেজি স্কুল গুলো আমাদের নিয়ন্ত্রনের বাইরে। সোনারগাঁয়ে আমি যোগদান করার পর একটি কেজি স্কুলও অনুমোদন পায়নি। প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চলে কাছাকাছি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও সেদিকে খেয়াল না করে খুলে বসেছে একই স্থানে একাধিক কিন্ডার গার্টেন স্কুল। ব্যাঙের ছাতার মত গড়ে ওঠা এসব কেজি স্কুল গুলো সরকারি শিক্ষানীতিমালার কোন তোয়াক্কা করছেন না। ব্যবসা কেন্দ্রিক এসব প্রতিষ্ঠানগুলোকে শিক্ষানীতিমালার আওতায় আনা উচিত।
অফিস: অফিসঃ ৪৪ ক অতীশ দীপঙ্কর রোড, মুগদা, ঢাকা
বার্তা কক্ষ: ইমেইলঃ dailynarayanganjerdak@gmail.com মোবাইলঃ ০১৬১৫৫৩৭৭৫৫
কারিগরি সহযোগিতায় ফ্লাস টেকনোলজি ওয়েব সাইট www.flashtechnology.net